দ্বীনি শিক্ষা কোন বয়সের সাথে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিশুদের যেমন শিক্ষা জরুরী, তেমনি যারা শৈশবে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি তারা বয়স্ক হলেও তাদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা জরুরী।
ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন, ‘নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ বয়স্ক অবস্থায় ইলম অর্জন করেছেন’। (বুখারী,১/১৭)
হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি এবং আমার এক প্রতিবেশী আনসারী (ইতবান ইবনে মালেক) মদীনার শহরতলীতে বনী উমাইয়্যা ইবনে যায়েদ গোত্রে বসবাস করতাম। আমরা পালাক্রমে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসতাম। সে একদিন আসত আর আমি একদিন আসতাম। আমি যেদিন আসতাম, ঐ দিনের ওহী (দ্বীনি ইলম) ইত্যাদি সংবাদ তার কাছে নিয়ে আসতাম। আবার সে যে দিন রাসূলের দরবারে আসত সেও অনুরূপ করত..। (সহীহ বুখারী, ১: ১৯)
অর্থাৎ তারা ইলম অর্জনের জন্য দিন ভাগ করে নিয়েছিলেন। একজন একদিন শিখে গিয়ে অপরজনকে শেখাতেন। পরের দিন অন্যজন এসে শিখে গিয়ে অপরজনকে শেখাতেন।
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিতঃ কিছু লোক নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আসল, তারা বলল, আমাদের সঙ্গে কিছু লোককে কুরআন-সুন্নাহ শিক্ষাদানের জন্য পাঠান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৭০ জন আনসারীকে তাদের কাছে পাঠালেন। যাদেরকে কুরা বলা হত। তাদের মধ্যে আমার মামা ‘হারাম’ও ছিলেন। তারা রাত্রে কুরআনে কারীম পড়তেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন। দিনের বেলায় তারা পানি এনে মসজিদে রাখতেন এবং কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। তা দ্বারা আহলে সুফফা ও দরিদ্রদের জন্য খাদ্য ক্রয় করতেন।…… (সহীহ মুসলিম, ২: ১৪৯, ইমারত অধ্যায়)
এতে বুঝা যায়, বহু সাহাবায়ে কেরাম দিনের বেলা কাজকর্মে ব্যস্ত থেকেও রাতের বেলা দ্বীন শিখতেন।
আবূ আনাস মালেক ইবনে আবী আমির (রা.) বলেন, আমি তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহর কাছে ছিলাম। তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবূ মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! আমরা জানি না, এই ইয়ামানী (উদ্দেশ্যে হযরত আবূ হুরায়রা) কি আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে বেশি জানে, না আপনারা বেশি জানেন? সে তো আল্লাহর রাসুল সম্পর্কে এমন কথা বলে যা তিনি বলেননি? উত্তরে হযরত তালহা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম আমরা এতে কোন সন্দেহ পোষণ করিনা যে, তিনি আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কিছু শুনেছেন, যা আমরা শুনিনি এবং এমন কিছু জেনেছেন যা আমরা জানিনি। আমরা ছিলাম সম্পদশালী। আমাদের বাড়ী-ঘর, পরিবার-পরিজন ছিল। আমরা আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সকাল-সন্ধ্যা আসতাম, এরপর ফিরে যেতাম। আর আবূ হুরায়রার সম্পদ ছিল না। পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ছিল না। তিনি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে থাকতেন এবং আল্লাহর রাসূল যেখানে যেতেন তিনিও সেখানে যেতেন। আমাদের সন্দেহ নেই যে, তিনি এমন কিছু শিখেছেন যা আমরা শিখিনি এবং এমন কিছু শুনেছেন যা আমরা শুনিনি। (মুস্তাদরাক হাকীম, ৪, ২৩০, হাদীস নং ৬২৮১)
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, কর্মব্যস্ত সাহাবায়ে কেরাম সকাল এবং সন্ধ্যায় আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দ্বীনি ইলম শেখার জন্য মেহনত করতেন।
আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন খুতবায় একদল মুসলমান সম্পর্কে খুব প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন, “ঐ সকল সম্প্রদায়ের কি হল যে, তারা তাদের প্রতিবেশিদেরকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করে না এবং তাদেরকে সৎকাজের আদেশ করে না ও অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করে না? আর ঐ সকল সম্প্রদায়ের কি হল যে, তারা তাদের প্রতিবেশিদের থেকে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করে না? আল্লাহর কসম! ঐ সকল সম্প্রদায় হয়তো তাদের প্রতিবেশিদেরকে দ্বীন শেখাবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর প্রতিবেশি সম্প্রদায়ও তাদের থেকে দ্বীন শিখবে। নতুবা আমি তাদের দুনিয়াতে দ্রুত শাস্তি প্রদান করব। অতঃপর মিম্বার থেকে নেমে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর লোকেরা বলল, এদের দ্বারা আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন? অন্যরা বলল, আমরা মনে করি যে, তিনি আশআ’রীদের উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তারা দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত সম্প্রদায়। আর তাদের প্রতিবেশিরা অবুঝ ও বেদুঈন। এ খবর আশআ’রীদের নিকট পৌছলে তারা রাসূলুল্লাহ সল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এক সম্প্রদায়ের খুব প্রশংসা করেছেন আর আমাদের নিন্দা করেছেন। তাহলে আমাদের কি সমস্যা? তদুত্তরে তিনি বললেন, ঐ সকল সম্প্রদায় হয়তো তাদের প্রতিবেশিদেরকে দ্বীন শিখাবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর প্রতিবেশি সম্প্রদায়ও তাদের থেকে দ্বীন শিখবে। নতুবা আমি তাদের দুনিয়াতে দ্রুত শাস্তি প্রদান করব। এরপর তারা বলল, আমরা কি অন্যদেরকে শেখাব? তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পূর্বোক্ত কথাকে পুনরাবৃত্তি করলেন। তারাও তাদের কথা পূনরাবৃত্তি করল। এরপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁর কথাকে পুনরাবৃত্তি করলেন। তারা বলল, তাহলে আমাদেরকে একটি বছর সুযোগ দিন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এক বছর সুযোগ দিলেন, যাতে তারা তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দান করতে পারেন। …… (কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ৮৪৫৩, ইবনুস সাকান বলেন, হাদীসটির সনদ গ্রহণযোগ্য)
এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, আলেমদের কর্তব্য, প্রতিবেশিদেরকে দ্বীন শেখানোর প্রতি পরিপূর্ণ যত্নবান হওয়া এবং সাধারণ মানুষেরও কর্তব্য প্রতিবেশী আলেমদের থেকে দ্বীন শেখার প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হওয়া।