মূল বই থেকে সংকলিত | মাসআলা নং ১ — ৭১
📋 কুরবানীর ওয়াজিব, নেসাব ও সময়
মাসআলা ১–৪
১
প্রশ্ন
কুরবানী কি ধরনের ইবাদত? কার উপর ওয়াজিব?
উত্তর
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এটি আদায় করা ওয়াজিব। যে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নর বা নারী ১০ যিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ যিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না, হাদীসে তাকে ঈদগাহে না আসতে বলা হয়েছে।
📖 মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস: ৩৫১৯; আতারগীব ওয়াতারহীব ২/১৫৫
২
প্রশ্ন
কুরবানীর নেসাব কত? কোন কোন সম্পদ নেসাবের হিসাবে গণ্য হবে?
উত্তর
কুরবানীর নেসাব হলো — স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নেসাব হলো এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলঙ্কার, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। এগুলোর কোনো একটি একা নেসাব পরিমাণ না হলেও, মিলিয়ে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য সমপরিমাণ হলে কুরবানী ওয়াজিব।
📖 আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
৩
প্রশ্ন
কুরবানীর নেসাব কি পুরো বছর থাকতে হবে?
উত্তর
না, কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়। কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে — অর্থাৎ ১০, ১১ ও ১২ যিলহজ্জের যেকোনো একদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
৪
প্রশ্ন
কুরবানীর সময় কখন শুরু ও শেষ হয়? কোন দিন করা উত্তম?
উত্তর
মোট তিনদিন কুরবানী করা যায় — যিলহজ্জের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্জের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম।
📖 মুয়াত্তা মালেক ১৮৮
৫
প্রশ্ন
নাবালেগ শিশু-কিশোরের উপর কুরবানী ওয়াজিব কি?
উত্তর
না, নাবালেগ শিশু-কিশোর সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন না হওয়ায় তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে তাদের অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
🕌 মুসাফির, দরিদ্র ও সময়সংক্রান্ত মাসায়েল
মাসআলা ৫–১১
৬
প্রশ্ন
মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব কি?
উত্তর
না। যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে), তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
📖 ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫
৭
প্রশ্ন
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব কি?
উত্তর
না, নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।
📖 রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
৮
প্রশ্ন
দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম কী? যদি সে পশু কিনে ফেলে তাহলে?
উত্তর
দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে ফেলে, তাহলে সেটি কুরবানী করা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
৯
প্রশ্ন
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে কী করবে?
উত্তর
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে তার উপর একটি উপযুক্ত ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি, তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দেবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
১০
প্রশ্ন
প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে?
উত্তর
যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব, তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কারণে প্রথম দিন ঈদের নামায না হলে, ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রথম দিনে কুরবানী করা জায়েয।
📖 সহীহ বুখারী ২/৮৩২; কাযীখান ৩/৩৪৪; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
১১
প্রশ্ন
রাতে কুরবানী করা যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো।
📖 মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০
১২
প্রশ্ন
কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে কী করতে হবে?
উত্তর
কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে, তাহলে ক্রয়কৃত পশুটিই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে, তাহলে পুরো গোশত সদকা করতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায়, তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
🐄 কুরবানীর পশু ও শরীক সংক্রান্ত মাসায়েল
মাসআলা ১২–২১
১৩
প্রশ্ন
কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয?
উত্তর
শুধুমাত্র উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এই গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়।
📖 কাযীখান ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
১৪
প্রশ্ন
নর ও মাদা উভয় পশুর কুরবানী কি জায়েয?
উত্তর
হ্যাঁ, যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর ও মাদা উভয়ই কুরবানী করা জায়েয।
📖 কাযীখান ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
১৫
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা কত?
উত্তর
বয়সসীমা নিম্নরূপ:
• উট — কমপক্ষে ৫ বছর
• গরু ও মহিষ — কমপক্ষে ২ বছর
• ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা — কমপক্ষে ১ বছর
তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কম হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয — তবে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই জায়েয হবে না।
📖 কাযীখান ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬
১৬
প্রশ্ন
এক পশুতে কতজন শরীক হতে পারবে?
উত্তর
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। কয়েকজন মিলে একটি কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ ৭ জন শরীক হতে পারবে। সাতের বেশি হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।
📖 সহীহ মুসলিম ১৩১৮; মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯; কাযীখান ৩/৩৪৯
১৭
প্রশ্ন
সাত শরীকের কুরবানীতে সবার অংশ কেমন হতে হবে?
উত্তর
সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ — এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। উট, গরু ও মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যায় (যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে) কুরবানী করা জায়েয।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭; সহীহ মুসলিম ১৩১৮
১৮
প্রশ্ন
কেউ যদি আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে, তাহলে?
উত্তর
যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে, তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানীও হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮; কাযীখান ৩/৩৪৯
১৯
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুতে আকীকার নিয়তে শরীক হওয়া যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হওয়া যাবে। এতে কুরবানী ও আকীকা — দুটোই সহীহ হবে।
📖 তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২
২০
প্রশ্ন
শরীকদের কারো উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে কি কারো কুরবানী সহীহ হবে?
উত্তর
শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে কারো কুরবানীই সহীহ হবে না।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০
২১
প্রশ্ন
কুরবানীর উত্তম পশু কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর
কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।
📖 মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬; আলমগীরী ৫/৩০০; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
⚠️ পশুর দোষ-ত্রুটি সংক্রান্ত মাসায়েল
মাসআলা ২২–৩১
২২
প্রশ্ন
খোঁড়া পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
যে পশু তিন পায়ে চলে এবং এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না, এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়।
📖 জামে তিরমিযী ১/২৭৫; সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩
২৩
প্রশ্ন
রুগ্ণ ও দুর্বল পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
এমন শুকনো দুর্বল পশু — যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না — তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়।
📖 জামে তিরমিযী ১/২৭৫; আলমগীরী ৫/২৯৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
২৪
প্রশ্ন
দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না, এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫; আলমগীরী ৫/২৯৮
২৫
প্রশ্ন
শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেলে কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে এবং সেই কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর শিং আংশিকভাবে ফেটেছে বা ভেঙ্গেছে কিন্তু গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সে পশুর কুরবানী জায়েয। আর যে পশুর শিং একেবারে উঠেইনি, সে পশুর কুরবানী করা জায়েয।
📖 জামে তিরমিযী ১/২৭৬; সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪
২৬
প্রশ্ন
কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা, সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী জায়েয। তবে জন্মগতভাবে যদি কান ছোট হয় তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।
📖 জামে তিরমিযী ১/২৭৫; মুসনাদে আহমদ ১/৬১০; ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮
২৭
প্রশ্ন
অন্ধ পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট, সে পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়।
📖 জামে তিরমিযী ১/২৭৫; কাযীখান ৩/৩৫২; আলমগীরী ২৯৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
২৮
প্রশ্ন
কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পর নতুন পশু কিনে কুরবানী করার পর হারানোটা পাওয়া গেলে কী করবে?
উত্তর
কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) উভয় পশু কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে একটি কুরবানী করলেই হবে, তবে দুটি করাই উত্তম।
📖 সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪; ইলাউস সুনান ১৭/২৮০; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯
২৯
প্রশ্ন
গর্ভবতী পশুর কুরবানী জায়েয কি? জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত পাওয়া গেলে কী করবে?
উত্তর
গর্ভবতী পশুর কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ।
📖 কাযীখান ৩/৩৫০
৩০
প্রশ্ন
ভালো পশু কেনার পর যদি এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যা কুরবানীর অযোগ্য করে, তাহলে কী করবে?
উত্তর
কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যা কারণে কুরবানী জায়েয হয় না, তাহলে ওই পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে না। এর বদলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে।
📖 খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬; ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯
🔪 জবাই সংক্রান্ত মাসায়েল
মাসআলা ৩৪–৩৮
৩১
প্রশ্ন
কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা কেমন? অন্যকে দিয়ে জবাই করা যাবে কি?
উত্তর
কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো।
📖 মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩; আলমগীরী ৫/৩০০
৩২
প্রশ্ন
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে কী করতে হবে?
উত্তর
অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পূর্ণ হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পূর্ণ করে। এক্ষেত্রে উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে, তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না।
📖 রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪
৩৩
প্রশ্ন
কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে কোনো উপকার নেওয়া যাবে কি?
উত্তর
কুরবানীর পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া — যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি — জায়েয নয়। যদি করে, তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিতে হবে।
📖 মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬; নায়লুল আওতার ৩/১৭২; কাযীখান ৩/৩৫৪
৩৪
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে কি?
উত্তর
কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর কষ্ট হবে না বলে মনে হয়, তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে।
📖 মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬; ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯
৩৫
প্রশ্ন
কয়েকজন মিলে কুরবানী করার সময় জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে কী হবে?
উত্তর
কেউ মারা গেলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয়, তাহলে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬; কাযীখান ৩/৩৫১
৩৬
প্রশ্ন
জবাইয়ের অস্ত্র কেমন হওয়া উচিত? পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো কেমন?
উত্তর
ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম এবং পশু নিস্তেজ হওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
৩৭
প্রশ্ন
এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করা যাবে কি?
উত্তর
না, এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট দেওয়া যাবে না।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
🍖 কুরবানীর গোশত বণ্টন ও চামড়া সংক্রান্ত মাসায়েল
মাসআলা ৩৯–৪৫
৩৮
প্রশ্ন
কুরবানীর গোশত কতদিন জমিয়ে রাখা যাবে?
উত্তর
কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশিও জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; সহীহ মুসলিম ২/১৫৯; মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮
৩৯
প্রশ্ন
কুরবানীর গোশত কীভাবে বণ্টন করতে হবে?
উত্তর
শরীকে কুরবানী হলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে; অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়। কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।
📖 আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭; কাযীখান ৩/৩৫১; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; আলমগীরী ৫/৩০০
৪০
প্রশ্ন
কুরবানীর গোশত বা চর্বি বিক্রি করা যাবে কি?
উত্তর
না, কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে।
📖 ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫; কাযীখান ৩/৩৫৪; আলমগীরী ৫/৩০১
৪১
প্রশ্ন
জবাইকারী, কসাই বা সহযোগীকে চামড়া বা গোশত পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর
জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে কুরবানীর পশুর চামড়া, গোশত বা কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পুর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসেবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫
৪২
প্রশ্ন
কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।
📖 ইলাউস সুনান ৭/২৮৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০
৪৩
প্রশ্ন
কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে কী করতে হবে?
উত্তর
কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটাই সদকা করা জরুরি। চামড়া বিক্রি করার সময় সদকার নিয়তে বিক্রি করবে; সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ।
📖 আদ্দুররুল মুখতার; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১; কাযীখান ৩/৩৫৪
৪৪
প্রশ্ন
কুরবানীদাতা কি নিজের কুরবানীর গোশত খেতে পারবে?
উত্তর
হ্যাঁ, কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব।
📖 সূরা হজ্জ ২৮; সহীহ মুসলিম ২২/১৫৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮
৪৫
প্রশ্ন
কাজের লোককে কুরবানীর গোশত দেওয়া যাবে কি?
উত্তর
কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া জায়েয নয়। তবে এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।
📖 আহকামুল কুরআন জাসসাস ৩/২৩৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬
📌 বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল
মাসআলা ৪০–৭১
৪৬
প্রশ্ন
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয কি?
উত্তর
হ্যাঁ, মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে এটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে, তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না — গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে।
📖 মুসনাদে আহমদ ১/১০৭; হাদীস ৮৪৫; ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮
৪৭
প্রশ্ন
অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে কী করতে হবে?
উত্তর
অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। তবে স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০
৪৮
প্রশ্ন
কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে কী করবে?
উত্তর
কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায়, আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে, তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে সে যদি গরীব হয় (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়), তার জন্য আরেকটি কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯
৪৯
প্রশ্ন
পাগল পশুর কুরবানী জায়েয কি?
উত্তর
পাগল পশুর কুরবানী করা জায়েয, তবে যদি এমন পাগল হয় যে ঘাস-পানি কিছুই খায় না এবং মাঠেও চরে না, তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না।
📖 আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬; ইলাউস সুনান ১৭/২৫২
৫০
প্রশ্ন
ঋণ করে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তি ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
৫১
প্রশ্ন
হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব কি?
উত্তর
যেসকল হাজী কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে, তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো একদিন মুকীম থাকবে এবং সামর্থ্যবান হবে, তার উপর ঈদুল আযহার কুরবানী করা জরুরি হবে।
📖 ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫
৫২
প্রশ্ন
নবী কারীম (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করার হুকুম কী?
উত্তর
সামর্থ্যবান ব্যক্তির নবী কারীম (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়ত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন।
📖 সুনানে আবু দাউদ ২/২৯; জামে তিরমিযী ১/২৭৫; ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮; মিশকাত ৩/৩০৯
৫৩
প্রশ্ন
তিন দিনের মধ্যে কোন দিন কুরবানী করা সবচেয়ে উত্তম?
উত্তর
১০, ১১ ও ১২ যিলহজ্জ — এই তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ তারিখ কুরবানী করা সবচেয়ে বেশি উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন।
📖 রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
৫৪
প্রশ্ন
খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা কেমন?
উত্তর
খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা উত্তম।
📖 ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮; মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪; ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩
৫৫
প্রশ্ন
জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা জায়েয কি?
উত্তর
হ্যাঁ, যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয, তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও তার ঈসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয। এই কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪
৫৬
প্রশ্ন
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী কোথায় করতে হবে?
উত্তর
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য যেকোনো স্থানে কুরবানী করা জায়েয।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০
৫৭
প্রশ্ন
কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই করবে?
উত্তর
কুরবানীদাতা এক স্থানে থাকলে এবং কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে — কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে সেই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলেই পশু জবাই করা যাবে।
📖 আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
৫৮
প্রশ্ন
কুরবানীর শেষ সময়ে অর্থাৎ ১২ যিলহজ্জের আগে মুকীম হলে কুরবানী ওয়াজিব হবে কি?
উত্তর
কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন (১২ যিলহজ্জ) কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার আগে মুকীম হয়ে গেলে, তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতঃপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে — তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫
৫৯
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুতে একই সময়ে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, এক কুরবানীর পশুতে আকীকা, হজ্জের কুরবানী (দমে শুকর) ইত্যাদির নিয়তে শরীক হওয়া যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬; আলমাবসূত সারাখছী ৪/১৪৪
৬০
প্রশ্ন
ঈদুল আযহার দিন প্রথমে কী খাওয়া সুন্নত?
উত্তর
ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্জের জন্য; ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়।
📖 জামে তিরমিযী ১/১২০; শরহুল মুনয়া ৫৬৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬
৬১
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি করা যাবে কি?
উত্তর
কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন হাড় ক্রয় করে থাকে এবং টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। তবে কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫; কাযীখান ৩/৩৫৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১
৬২
প্রশ্ন
কুরবানীর রাতে অর্থাৎ ১০ ও ১১ তারিখ রাতে জবাই করা কেমন?
উত্তর
১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুন জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই।
📖 ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৬
৬৩
প্রশ্ন
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে কি?
উত্তর
হ্যাঁ, কুরবানীর পশু জবাই করার পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না।
📖 কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫
৬৪
প্রশ্ন
মোরগ কুরবানী করা জায়েয কি?
উত্তর
কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না-জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে মোরগ করা যাবে না।
📖 খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪; ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৩
৬৫
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে কী করবে?
উত্তর
কুরবানীর পশুর বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চাটি জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। যদি সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে বাচ্চাকেও জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দেবে।
📖 কাযীখান ৩/৩৪৯; আলমগীরী ৫/৩০১; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩
৬৬
প্রশ্ন
কুরবানীর পশুর গোশত তিন ভাগে ভাগ না করে পুরোটা নিজে রেখে দিলে কি জায়েয হবে?
উত্তর
হ্যাঁ, পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই; তবে এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীন ও এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া উত্তম।
📖 বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; আলমগীরী ৫/৩০০
📜 কুরবানীর ঐতিহাসিক ইতিহাস
পেজ ১৫-১৬
৬৭
প্রশ্ন
কুরবানীর বিধান কখন থেকে চলে আসছে?
উত্তর
কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও বিশেষ ইবাদত। হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে কুরবানী চলে আসছে। তবে সব নবীর শরীয়তে এর পদ্ধতি এক ছিল না। ইসলামী শরীয়তে এর যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূল সূত্র 'মিল্লাতে ইবরাহীমী'তে বিদ্যমান ছিল। এজন্য কুরবানীকে 'সুন্নতে ইবরাহীমী' বলা হয়।
📖 কুরআনুল কারীম; সূরা সাফফাত
৬৮
প্রশ্ন
হযরত ইবরাহীম (আ.) কীভাবে সন্তান লাভ করেছিলেন?
উত্তর
বহু দিন ধরে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কোনো সন্তান হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সন্তান জন্মের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায়। জীবনসন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নেক সন্তানের জন্য দুআ করতেন — "হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন।" (সূরা সাফফাত ৩৭:১০০) অবশেষে আল্লাহ তাঁর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে একজন সহনশীল পুত্রসন্তান দান করেন। এই সন্তানের নাম রাখেন ইসমাঈল।
📖 সূরা সাফফাত (৩৭): ১০০; সূরা ইবরাহীম (১৪): ৩৯
৬৯
প্রশ্ন
হযরত ইবরাহীম (আ.) পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখার পর কী করেছিলেন?
উত্তর
হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন তিনি পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে যবেহ করছেন। নবীগণের স্বপ্ন ওহীর মতো। তিনি পুত্রকে বললেন — "হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে যবেহ করছি। তাই তুমি চিন্তা করে দেখ, তোমার অভিমত কী।" ইসমাঈল (আ.) সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন — "হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।" (সূরা সাফফাত ৩৭:১০২) যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য রাজি হয়ে গেলেন, তখন ইবরাহীম (আ.) পুত্রকে যবেহ করার জন্য শুইয়ে দিলেন এবং ছুরি চালালেন। আল্লাহ তাআলার আদেশে সেখানে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেওয়া হলো — ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে সেটি যবেহ করলেন। ইসমাঈল (আ.) জীবিত ও নিরাপদ থাকলেন।
📖 সূরা সাফফাত (৩৭): ১০২-১০৭
৭০
প্রশ্ন
কুরআনে এই ঘটনা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
উত্তর
আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আ.)-কে সম্বোধন করে বললেন — "হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটি ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। এবং আমি এক মহান কুরবানীর (পশুর) বিনিময়ে তাকে (ইসমাঈল) মুক্ত করলাম।" এই ঐতিহাসিক মহান পরীক্ষার স্মরণেই কুরবানীর বিধান চালু রয়েছে এবং কুরবানীকে 'সুন্নতে ইবরাহীমী' বলা হয়।
📖 সূরা সাফফাত (৩৭): ১০৩-১০৭